🌌 পদার্থের গঠন (Structure of Matter) — বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর রহস্য উন্মোচন
পদার্থ (Matter) আমাদের চারপাশে সর্বত্র বিদ্যমান — বাতাস, জল, ধাতু, এমনকি আমাদের শরীরও পদার্থ দিয়ে গঠিত। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই পদার্থ আসলে কী দিয়ে তৈরি? আজকের আলোচনায় আমরা জানব পদার্থের গঠন, তার উপাদান, পরমাণু ও অণুর রহস্য, এবং মৌলের পরিচয়।
—
🧪 মৌলিক ও যৌগিক পদার্থ: পদার্থের মূল শ্রেণিবিন্যাস
পদার্থকে সাধারণভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় — মৌলিক পদার্থ ও যৌগিক পদার্থ।
🌟 মৌলিক পদার্থ (Element)
যে পদার্থকে রাসায়নিকভাবে ভেঙে দিলে আর কোনো নতুন পদার্থ পাওয়া যায় না, তাকে মৌলিক পদার্থ বলা হয়।
উদাহরণ: হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (O), লোহা (Fe), সোনা (Au) ইত্যাদি।
এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ১১৮টি মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছেন।
পদার্থের গঠন ৩য় অধ্যায় (রসায়ন) SSC (Structure of Matter)
💧 যৌগিক পদার্থ (Compound)
যখন দুই বা ততোধিক মৌল নির্দিষ্ট অনুপাতে রাসায়নিকভাবে যুক্ত হয়, তখন তৈরি হয় যৌগিক পদার্থ।
উদাহরণ: জল (H₂O) হলো হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের যৌগ।
যৌগিক পদার্থের ধর্ম সবসময় এর উপাদান মৌলগুলোর থেকে আলাদা হয়।
—
⚛️ পরমাণু ও অণু: ক্ষুদ্র জগতের নায়ক
🔹 পরমাণু (Atom)
মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা যা পদার্থের ধর্ম বজায় রাখে।
পরমাণু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়, কিন্তু সাধারণত একা থাকতে পারে না (নিষ্ক্রিয় গ্যাস ছাড়া)।
🔹 অণু (Molecule)
দুই বা ততোধিক পরমাণু রাসায়নিক বন্ধনে যুক্ত হয়ে যে কণিকা তৈরি করে, তাকে অণু বলা হয়।
অণু হলো পদার্থের ক্ষুদ্রতম অংশ যা স্বতন্ত্রভাবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে।
উদাহরণ: জল (H₂O), অক্সিজেন (O₂), কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)।
—
🔤 মৌলের প্রতীক ও যৌগের সংকেত
বিজ্ঞানে মৌল ও যৌগ চিহ্নিত করার জন্য বিশেষ প্রতীক ব্যবহৃত হয়।
✅ মৌলের প্রতীক (Symbol)
মৌলের ইংরেজি বা ল্যাটিন নামের সংক্ষিপ্ত রূপ।
প্রথম অক্ষর বড় হাতের এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয় অক্ষর ছোট হাতের লেখা হয়।
যেমন:
হাইড্রোজেন → H
অক্সিজেন → O
ক্যালসিয়াম → Ca
সোডিয়াম (Natrium) → Na
✅ যৌগের সংকেত (Formula)
যৌগে কোন কোন মৌলের কতটি পরমাণু আছে তা বোঝায়।
উদাহরণ: H₂O → দুটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেন পরমাণু।
—
⚙️ পরমাণুর মৌলিক কণিকা: ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন
একটি পরমাণু তিনটি প্রধান কণিকা দ্বারা গঠিত — ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন।
মৌলিক কণিকা প্রতীক আধান (চার্জ) আপেক্ষিক আধান ভর (গ্রাম) আপেক্ষিক ভর
ইলেকট্রন e⁻ -1.60×10⁻¹⁹ C -1 9.11×10⁻²⁸ প্রায় 0
প্রোটন p⁺ +1.60×10⁻¹⁹ C +1 1.673×10⁻²⁴ 1
নিউট্রন n⁰ 0 0 1.675×10⁻²⁴ 1
🔸 ইলেকট্রন — ঋণাত্মক আধানযুক্ত এবং নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান।
🔸 প্রোটন — ধনাত্মক আধানযুক্ত এবং নিউক্লিয়াসে অবস্থান করে।
🔸 নিউট্রন — নিরপেক্ষ কণিকা, নিউক্লিয়াসে অবস্থান করে এবং প্রোটনের ভরের সমান প্রায়।
—
🔢 পারমাণবিক সংখ্যা ও ভর সংখ্যা
🔹 পারমাণবিক সংখ্যা (Atomic Number – Z)
কোনো মৌলের নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটন সংখ্যাই হলো পারমাণবিক সংখ্যা।
একটি নিরপেক্ষ পরমাণুতে প্রোটন ও ইলেকট্রন সংখ্যা সমান।
👉 উদাহরণ: সোডিয়াম (Na)-এর পারমাণবিক সংখ্যা ১১ → এর প্রোটন সংখ্যা = ১১।
🔹 ভর সংখ্যা (Mass Number – A)
পরমাণুর প্রোটন ও নিউট্রন সংখ্যার যোগফল হলো ভর সংখ্যা।
সূত্র:
> A = Z + N
(ভর সংখ্যা = প্রোটন সংখ্যা + নিউট্রন সংখ্যা)
👉 উদাহরণ: সোডিয়াম (Na)-এর প্রোটন = ১১, নিউট্রন = ১২ →
ভর সংখ্যা = ১১ + ১২ = ২৩
এভাবে সোডিয়ামকে প্রকাশ করা যায়:
₂₃₁₁Na
—
🌍 কেন “পদার্থের গঠন” জানা জরুরি?
“পদার্থের গঠন” বোঝা মানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মূল কাঠামো বোঝা। এটি রসায়নের মেরুদণ্ড — কারণ প্রতিটি রাসায়নিক বিক্রিয়া, পদার্থের ধর্ম, এমনকি জীববিজ্ঞানের মৌলিক ক্রিয়াকলাপও এর ওপর নির্ভর করে।
—
📚 উপসংহার
পদার্থের গঠন সম্পর্কিত এই ধারণাগুলো কেবল পাঠ্যপুস্তক নয়, বাস্তব জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমরা প্রতিদিন যে বাতাসে নিঃশ্বাস নেই, যে জল পান করি, যে ধাতু ব্যবহার করি — সবকিছুই পরমাণু ও অণুর জটিল সমন্বয়।
তাই বলা যায়, “পদার্থের গঠন” বোঝা মানে বিজ্ঞানের হৃদয়ে প্রবেশ করা